বাবুলকে গ্রেপ্তারের দাবি শ্বশুরের

Home » বাবুলকে গ্রেপ্তারের দাবি শ্বশুরের
বাবুলকে গ্রেপ্তারের দাবি শ্বশুরের

মেয়ের হত্যাকারী’ হিসেবে চট্টগ্রামের সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তাঁর শ্বশুর। তাঁর মেয়ে মাহমুদা খানম মিতুকে গত বছরের ৫ জুন চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড় এলাকায় ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন অবশ্য বাবুল আক্তার শ্বশুরের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই ছিলেন।

গত শনিবার রাজধানীর মেরাদিয়া ভুইয়াপাড়ার বাড়িতে বসে মাহমুদার বাবা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন জামাতা বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছি হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কারণে নাকি তাকে (জামাতা) চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে কোনোভাবেই সেটা ন্যায়বিচার হতে পারে না। আমার মেয়ের খুনিকে কেউ কিছুর বিনিময়ে ছেড়ে দিতে পারে না।’

মোশাররফ হোসেনের প্রশ্ন, জড়িত না থাকলে বাবুল চাকরি ছাড়লেন কেন? আর মুছা কেন তাঁর মেয়েকে খুন করবেন? মুছা যদি খুন করে থাকেন, সেটা বাবুলের কারণেই করেছেন। এক বছরেও পুলিশ মুছার হদিস বের করতে না পারায় হতাশ তিনি।

মাহমুদার বাবার এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বাবুল আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে অনেক রকম অভিযোগ উঠতে পারে। তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তোলা ঠিক নয়। এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। তবে চাকরি ছাড়া নিয়ে শ্বশুরের তোলা প্রশ্নের বিষয়ে কিছু বলতে চাননি তিনি। তিনি নিজেও স্ত্রী হত্যার বিচার ও সুষ্ঠু তদন্ত চান।

মাহমুদা হত্যার আজ এক বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু এত দিনেও আলোচিত এ মামলার কোনো কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। মাহমুদা খুনের পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে বাবুলের জড়িত থাকার অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু প্রথম দিকে মাহমুদার মা-বাবা এসব অভিযোগ উড়িয়ে দেন। সর্বশেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেনের বাসায় গেলে এই হতাকাণ্ডে বাবুল জড়িত বলে তিনি অভিযোগ করেন।

মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মাহমুদা খুন হওয়ার পর বাবুল আক্তার ছেলেমেয়েকে নিয়ে মেরাদিয়ার ভূঁইয়াপাড়ার তাঁর বাসায় উঠেছিলেন। কিন্তু বিপদ সরে গেছে মনে করে অন্যত্র চলে যান। এরপর বাবুলের ঘনিষ্ঠ লোকজনের কাছ থেকে তাঁরা তথ্য পান, মাহমুদা হত্যার পরিকল্পনাকারী বাবুল আক্তার নিজেই। একাধিক নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। এতে বাধা দেওয়ায় তিনি মাহমুদাকে হত্যার হুমকি দেন। নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মাহমুদা একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। খুন হওয়ার আগে মাহমুদা এসব কথা তাঁদের জানিয়েছিলেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ১৫টি বিষয় চিহ্নিত করে লিখিত দিয়েছিলেন। তা আমলে নেওয়া হয়নি। দুই নারী ও বাবুল আক্তারের দুই ঘনিষ্ঠসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানালেও পুলিশ তা শোনেনি।

জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বাবুলের শ্বশুর এসব অভিযোগ তাঁদের কাছেও করেছেন। তাঁরা সব দিক খতিয়ে দেখছেন। ঈদের পরে বাবুলকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

মাহমুদা হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আক্তার নিজে বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় তিনজনকে আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন। হত্যাকাণ্ডের তিন সপ্তাহ পর মো. ওয়াসিম ও আনোয়ার নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিনই তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁরা স্বীকার করেন, কামরুল শিকদার ওরফে মুছার নেতৃত্বে হত্যাকাণ্ডে তাঁরা সাত-আটজন অংশ নেন। বাবুল আক্তারের ঘনিষ্ঠ সোর্স হিসেবে কাজ করতেন মুছা।

কিন্তু গত এক বছরেও ‘নিখোঁজ’ মুছার সন্ধান পায়নি পুলিশ। যে কারণে মামলার তদন্তও এগোয়নি। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবর মাসে মুছার সন্ধান চেয়ে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ। এখনো আশায় আছে, মুছা ফিরলে মামলার জট খুলবে।

অবশ্য মুছার স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি, মাহমুদা হত্যার ১৭ দিন পরই চট্টগ্রাম নগরের বন্দর এলাকার এক আত্মীয়র বাসা থেকে পুলিশের সাদাপোশাকের সদস্যরা মুছাকে তুলে নিয়ে গেছেন। কিন্তু শুরু থেকেই এই দাবি অস্বীকার করে আসছে পুলিশ।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর গত ২৪ জুন মধ্যরাতে ঢাকার বনশ্রী এলাকার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুল আক্তারকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে আবার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে ৬ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বাবুলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হলো। ওই সময় অভিযোগ ওঠে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় বাবুলকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল চাকরি ছাড়লে তাঁকে মামলা থেকে অব্যহতি দেওয়া হবে। সেই শর্ত মেনে বাবুল অব্যাহতি দিলেও পরে তা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তবে এ নিয়ে পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের পর যেদিন ছেড়ে দেওয়া হয়, তার এক দিন পর (গত বছরের ২৬ জুন) চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল বাহার সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, মুছার নেতৃত্বে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এতে ওয়াসিম, আনোয়ারসহ সাত-আটজন অংশ নেন। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে জবানবন্দি দেন। তাঁরা বলেন, মুছার নেতৃত্বে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু মুছা কার নির্দেশে এবং কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, সে ব্যাপারে তাঁরা কিছু বলেননি।

জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডে ওয়াসিম, আনোয়ার, মো. রাশেদ, নবী, মো. শাহজাহান, মুছা ও মো. কালু অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে নবী ও রাশেদ গত বছরের ৪ জুলাই রাঙ্গুনিয়ায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলে ছিলেন ওয়াসিম, মুছা ও নবী। মাহমুদাকে ছুরিকাঘাত করেন নবী। অস্ত্র সরবরাহ করেন এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা। তাঁদের মধ্যে মুছা ও কালুকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানায় পুলিশ।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল বাহার গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, একটা সময় পর্যন্ত মুছার জন্য অপেক্ষা করা হবে। তাঁকে পাওয়া না গেলে অভিযোগপত্র দিয়ে দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.